হরমুজ প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্ত : আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার পটভূমিতে ইরানের বৈধতা। লাভ ক্ষতির ফিরিস্তি। ভূমিকাঃ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে সামরিক হামলা চালানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সংসদ হরমুজ প্রণালী বন্ধের অনুমোদন দিয়েছে। ইরানের এই পদক্ষেপ শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে সমুদ্র আইন (UNCLOS ১৯৮২)-এর আলোকে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব হরমুজ প্রণালী বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী প্রণালীর উত্তর অংশ সম্পূর্ণ ইরানের উপকূলে অবস্থিত, যা ইরানকে স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রাখে। শুধু ভৌগোলিক নয়, সামরিক সক্ষমতা, উপকূলীয় নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা ইরানের নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ইরান হরমুজ প্রণালীতে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং ড্রোন ব্যবহার করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছে। এই উপস্থিতি কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা নয়, বরং পশ্চিমা আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় বৈধ আত্মরক্ষার অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পারস্য উপসাগরে বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবতা নির্ভর এবং আইনসম্মত। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও ইরানের অধিকার UNCLOS ১৯৮২: ইরানের অবস্থান ইরান ১৯৮২ সালে সমুদ্র আইন সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশনে (UNCLOS) স্বাক্ষর করেছে। তবে তারা র্যাটিফিকেশন করেনি, অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে নেয়নি। বিশেষ করে যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক যানবাহনের অবাধ চলাচলের বিষয়টি ইরান গ্রহণ করেনি, যা ইরানের নিরাপত্তা বাস্তবতা অনুযায়ী যৌক্তিক। UNCLOS-এর প্রাসঙ্গিক ধারা ✅ অনুচ্ছেদ ৩৮: ট্রানজিট প্যাসেজএই অনুচেদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালী দিয়ে জাহাজ ও বিমানের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে, তবে চলাচল কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় রাষ্ট্রের শান্তি, শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার পরিপন্থী হতে পারবে না। ✅ অনুচ্ছেদ ২৫(৩): নিরাপত্তারক্ষার ব্যবস্থাউপকূলীয় রাষ্ট্র তার জলসীমায় ক্ষতিকর বা অবাঞ্ছিত জাহাজের প্রবেশ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধতা ইরানের উপকূলীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এবং বিদেশি যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন উপস্থিতি ইরানের জন্য হুমকি তৈরি করলে, হরমুজ প্রণালী আংশিক বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী নয়, বরং বৈধ আত্মরক্ষার অধিকার। ইরানের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পায় এবং এ অঞ্চলের শান্তি রক্ষায় ইরানের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। হরমুজ প্রণালী বন্ধের লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ ইরানের লাভ জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হবে। পশ্চিমা শক্তিকে কূটনৈতিক সমঝোতায় আসতে বাধ্য করা যাবে। আঞ্চলিক ছোট দেশগুলো ইরানের ভূমিকাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করবে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে ইরান কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারবে। পশ্চিমা দেশের ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ। সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি, যা নিজ দেশের জন্যও বিপজ্জনক। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি। আঞ্চলিক ছোট দেশগুলোর বাস্তবতা তারা উপলব্ধি করবে, আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ইরানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রবণতা বাড়বে। পশ্চিমা শক্তির অন্ধ সমর্থন থেকে সরে এসে আঞ্চলিক সমঝোতার পথে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। শেষ কথা : ইরান আন্তর্জাতিক আইন মেনেই আত্মরক্ষা, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার ন্যায্য অধিকার প্রয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্ত কেবল ইরানের প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশলগত পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ইরানকে এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়। তাই ইরানের বর্তমান অবস্থান বাস্তবসম্মত, আইনগত এবং সময়োপযোগী। বিশ্লেষক:জয়নাল মাযহারীআইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট, কুমিল্লা। Post navigation গাজার শিশুদের আকুতি শুনছে কি কেউ নতুন করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা